পাটের উৎপাদন ও বহুমুখী ব্যবহার

কসময় দেশে কৃষকের উৎপাদিত অন্যতম প্রধান পণ্যই ছিল পাট। আর সোনালি আঁশ নামে খ্যাত পাটই ছিল রপ্তানি আয়ের বড় খাত। পাট রপ্তানিই ছিল রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান অবলম্বন। পাটকে ঘিরে দেশে গড়ে উঠেছিল বহু নৌবন্দর। সেসব বন্দর দিয়ে বড় বড় জাহাজে পাট রপ্তানি হওয়ায় ওগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল এবং তৎপরবর্তী পাকিস্তান আমলে বড় বড় পাট ব্যবসায়ীরা পাটকে ঘিরে গড়ে তুলেছিল বিরাট বিরাট পাটের গুদাম। আজ কিন্তু সেসব শুধুই স্মৃতি। কালের বিবর্তনে ও ক্ষমতাসীনদের ভ্রান্ত নীতির কারণে পাট হারিয়েছে তার অতীত ঐতিহ্য। এমনকি কৃষিপণ্য বলতে এক সময় যে পাটই ছিল অন্যতম, তা আজ হারিয়ে ফেলেছে সেই পরিচয়ও।

মহাজোট সরকারের ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটকে কৃষিপণ্যের স্বীকৃতি দিয়ে পাটের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ বিষয়ে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আজমের নানা পদক্ষেপও আমরা দেখেছি।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ভবনে এক মতবিনিময় সভায় তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন। সে সভায় আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেদিন তিনি মোড়কে পাটজাত পণ্যের শতভাগ ব্যবহারকে নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানান।

ওই মতবিনিময় সভায় সেদিন আমি বলেছিলাম, মোড়কে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে আগে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিয়ে পিপি ব্যাগ কারখানা বন্ধ করতে হবে। ক্রেতার ধর্মই হচ্ছে, তুলনামূলক যে পণ্যের মূল্য কম, সে পণ্যই কেনা। এভাবেই দীর্ঘদিন পাটের বস্তার ব্যবহার না থাকায় পিপি ব্যাগের ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে।

ইতোমধ্যেই দেশে ব্যাংকের বিনিয়োগে নানা উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে পিপি ব্যাগের কারখানা স্থাপন করেছেন। যেখানে ৫০ কেজি ওজনের পণ্যধারণ ক্ষমতার একটি পিপি ব্যাগের মূল্য সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ টাকা, সেখানে একই পরিমাণ পণ্যধারণ ক্ষমতার একটি পাটের বস্তার সর্বনিম্ন মূল্য ৫০ টাকা। কাজেই সবাই পিপি ব্যাগ কিনে পণ্য বাজারজাত করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এমতাবস্থায় আগে পিপি ব্যাগের কারখানা বন্ধ করা উচিত।

তা না করে শুধু আলোচনা করলেই মোড়কে পাটজাত পণ্যের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। হয়েছেও তাই। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ক্রমে চাল, গম, আটা, চিনিসহ ১৮টি নিত্যপণ্যের পাটজাত মোড়ক ব্যবহারে বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি করে। কিন্তু আজও তা শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ এখন পর্যন্ত পিপি ব্যাগ প্রস্তুতকারী কারখানা সরকার বন্ধ করেনি। ফলে পিপি ব্যাগের উৎপাদনও হচ্ছে, তা সহজলভ্য ও দাম কম হওয়ায় সহজে সবাই ব্যবহারও করছে।

Jute App

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ধান, চাল বাজারজাতকরণে সরকার পাটের বস্তা ব্যবহারে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। চালকল থেকে শুরু করে পাইকারি বাজারে সরকারের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করায় ব্যবসায়ীরা পাটের বস্তা ব্যবহার শুরু করেন। এরই মধ্যে ২০১৭ সালে হাওর অঞ্চল খ্যাত ৪টি জেলায় অতিবর্ষণ ও আগাম বন্যার কারণে আধপাকা ধান পানিতে তলিয়ে যায়।

মুহূর্তেই চালের বাজারদর হু হু করে বাড়তে থাকে। তখন চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ঢাকায় ডাকা হয়। খাদ্যমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সচিবালয়ের ওই বৈঠকে চালের দাম কমিয়ে আনতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করা হয়।

সেদিন ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, শুধু পাটের ব্যাগ বাড়তি মূল্যে কেনার কারণে চালের বাজার কেজিতে ২-১ টাকা বৃদ্ধি পায়। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা দেন, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে এই মুহূর্ত থেকে পিপি ব্যাগে চালভর্তি করে বাজারজাত করা যাবে। যেমনি ঘোষণা তেমনি কাজ। শুরু হলো, পিপি ব্যাগের দেদার ব্যবহার।

সরকারের পাটকলগুলোয় প্রস্তুতকৃত লাখ লাখ বস্তা অবিক্রীতই থেকে গেল। সেই যে পিপি ব্যাগের ব্যবহার শুরু হলো, যা আজ পর্যন্ত অব্যাহতভাবে নির্বিঘ্নেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এরই মধ্যে মহাজোট সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলে নবগঠিত মন্ত্রিসভার পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ‘পাটের রাজধানী’ নারায়ণগঞ্জের সন্তান, সফল ব্যবসায়ী গোলাম দস্তগীর গাজী।

ঐতিহ্যগতভাবে পাটের ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্ব অনেক বেশি। হয়তো পাটের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নতুন মন্ত্রীর প্রাণান্ত প্রচেষ্টা থাকবে। এরই মধ্যে তিনি জাতীয় এক দৈনিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, পাটের উৎপাদন ও বহুমুখী ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। কাঁচাপাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, পাটজাত পণ্য রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বাড়াতে এবং পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন বর্জনের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটপণ্যকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরা এবং পরিচিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

তার নির্দেশে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে ২৩৫ ধরনের পাটপণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র চালু হয়েছে। পাটপণ্যের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার বাড়াতে চারকোল, সিস কস, পাটপাতার পানীয়সহ নতুন নতুন বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এমনকি পাট থেকে সোনালি ব্যাগ বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হিসেবে কাজ করবে মর্মেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি আরও বলেছেন, পাটকাঠি থেকে চারকোল উৎপাদন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। কীভাবে চারকোলের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে তিনি বাংলাদেশ চারকোল ম্যানুফাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠি উৎপাদিত হয়।

এর মধ্যে যদি ৫০ ভাগ পাটকাঠি দিয়ে চারকোল উৎপাদন করা যায়, তাহলে প্রতিবছর আড়াই লাখ টন চারকোল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কর্মসংস্থানের দ্বারও সম্প্রসারিত হবে। বর্তমানে চীনে চারকোল রপ্তানি হচ্ছে। আগামীতে জাপান, ব্রাজিল, তুর্কমেনিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, কানাডা ও মেক্সিকোতে চারকোল রপ্তানি করার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বাস্তবেই পাট একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। ইতোমধ্যেই বিজ্ঞানীরা পাট থেকে উন্নতমানের মিহি সুতা আবিষ্কার করেছেন। যা দিয়ে উন্নত কাপড় প্রস্তুত করা সম্ভব। আর বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন অনেক বেশি সমৃদ্ধ। যদি পাটের উন্নত সুতার কাপড় বিদেশে রপ্তানি করা যায়, তা হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাট তার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।